নাগরিক প্লাটফর্মের মিডিয়া ব্রিফিংয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

প্রস্তাবিত বাজেটে ত্রিমুখী চাপে থাকবে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ কমার সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত নেই; বরং উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্ন মজুরি হার ও সঞ্চয় হারানোর শঙ্কায় এ জনগোষ্ঠী ত্রিমুখী চাপে থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে গতকাল ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: অসুবিধাগ্রস্ত মানুষের জন্য কী আছে?’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।

নাগরিক প্লাটফর্ম আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাজেটে সার্বিকভাবে নীতিগত কাঠামোর দিক থেকে পিছিয়ে পড়া মানুষ এবং প্রথাগতভাবে যারা অসুবিধাগ্রস্ত, তাদের প্রতি সংবেদনশীলতা লক্ষ্য করেছি। সে কারণে বিভিন্ন ধরনের অসুবিধাগ্রস্ত মানুষের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপের কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের জন্য যে আর্থিক কাঠামো প্রয়োজন তা অত্যন্ত দুর্বল। অর্থাৎ যে বরাদ্দগুলো দেয়া হয়েছে, সেগুলো শেষ পর্যন্ত বাস্তবে পাওয়া যাবে কিনা, তার নিশ্চয়তা নেই। একই সঙ্গে সেগুলো গুণগত মান বজায় রেখে ব্যবহার করা হবে কিনা, সে আশঙ্কাও রয়ে গেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘কর ও শুল্ক ব্যবস্থাপনায় যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছে, সেগুলো হয়তো কিছু ক্ষেত্রে বিনিয়োগবান্ধব। পাশাপাশি আর্থিক খাত, জ্বালানি খাত, প্রশাসনিক সংস্কার এবং বেতন বৃদ্ধিসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন না হলে সেগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। ফলে সাধারণ বা নিম্ন আয়ের মানুষ কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এ সুবিধা ভোগ করতে পারবে না।’

নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক বলেন, ‘গরিব ও অসুবিধাগ্রস্ত মানুষের জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তাদের জীবনমানের সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হবে না। দ্বিতীয়ত, যদি উৎপাদনমুখী ও আয়বর্ধক কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগের সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মজুরি বৃদ্ধি না পায়, তাহলে এ বাজেটের সুফল মিলবে না। তৃতীয়ত, বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি তাদের সামান্য সঞ্চয়টুকুও ভেঙে খেতে হয়, তাহলে এ বাজেট তাদের জন্য কোনো কার্যকর সুরাহা দিতে পারবে না।’ এসব বিষয়ের ওপর আগামী দিন বাজেট কতটা সুরক্ষা দিতে পারে, সেদিকে বিশেষভাবে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রস্তাবিত বাজেটে চিন্তাশীলতা ফুটেঁ উঠলেও ভিত্তি দুর্বল বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘বাজেটকে কেন্দ্র করে যে নীতিকাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটা মোটামুটিভাবে চিন্তাশীল। কিন্তু এর পরই সমস্যার সূত্রপাত। কারণ কাঠামোটি অত্যন্ত দুর্বল, সম্ভবত অকার্যকর আর্থিক কাঠামোর ওপর স্থাপন করা হয়েছে।’

ব্রিফিংয়ে নাগরিক প্লাটফর্মের কোর সদস্য ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষায় প্রায় ২ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা ও ডকুমেন্টে যা আছে, সেটি আসলে ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। ২ শতাংশ যেটা এসেছে, সেটাই হচ্ছে কার্যত প্রকৃত হিসাবের প্রতিফলন। তার পরও যতটুকু এসেছে, এটি এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ বরাদ্দ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এটি একটি একক খাত হিসেবে বরাদ্দ হয়েছে।’

এখন দুটি বিষয়ে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথম বিষয়টি স্কুলের ওয়াশ সুবিধা। বাস্তব অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। আমরা শুধু বলি, মেয়েদের শিক্ষায় আনব, ছেলেদের শিক্ষায় আনব, শিক্ষার হার বাড়াবো। কিন্তু স্কুলের ওয়াশরুমগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। আরেকটি বিষয় হচ্ছে শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি। তবে আমি একে বরাদ্দ না বলে বিনিয়োগ বলতে চাই।’ মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্যয়কে বরাদ্দ নয়, বিনিয়োগ হিসেবেই দেখা উচিত বলেও মন্তব্য করেন রাশেদা কে চৌধুরী।

ব্রিফিংয়ে বক্তারা শুধু বাজেট দেয়া নয়, বরং সমাজের সব মানুষের জন্য বাজেট প্রস্তুতের কথা তুলে ধরেন। বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘আমাদের অধিকাংশ বাজেট থাকে প্রকল্পভিত্তিক। সেখানে সাধারণ জনগোষ্ঠীর যে প্রতিফলন দরকার সেটা দেখা যায় না। বিশেষত শিশু, বৃদ্ধ, পাহাড়ি ও অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য এখনো রয়ে গেছে। এছাড়া প্রয়োজন, বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা। এটি না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।’

বাজেটকে বাস্তবায়নযোগ্য ও জবাবদিহি করার পরামর্শও দিয়েছেন তারা। এ বিষয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘প্রথমত চলতি তথ্যের ভিত্তিতে প্রাক্কলন হালানাগাদ করা। দ্বিতীয়ত, প্রতি তিন মাস পর পর সংসদে অর্থমন্ত্রীকে বর্তমান পরিস্থিতি ও বাজেট বাস্তবায়ন উপস্থাপন করতে হবে। তৃতীয়ত, আমরা এমন একটি পার্লামেন্টারি ককাস তৈরি করব, যেখানে সংসদ সদস্যরাও থাকবেন। সর্বশেষ রিফর্ম ট্র্যাকার, যেখানে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও সরকার কী চায় সে বিষয় তুলে ধরতে হবে।’

অনুষ্ঠানের সভাপতি সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সমাজের বিভিন্ন প্রান্তিক গোষ্ঠী, বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া ও পিছিয়ে রাখা মানুষকে বাজেটের আওতায় আনতে হবে। যদি সত্যিকার অর্থে একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়তে চাই, তাহলে এ বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। এটি কেবল বাজেটের বিষয় নয়, বরং এটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি, বাস্তবায়ন সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহিতার বিষয়।’

ব্রিফিংয়ে আরো উপস্থিত ছিলেন অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান, বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন, সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান, ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান এবং কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষসহ অনেকে।

আরও